Monday, June 25, 2012

সিলেটি রামায়ণ

জ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। আমি সিলেটি রামায়ণের কথাই বলছি। আরো প্রশ্ন আপনার মাথায় আসতেই পারে। যেমন, হঠাৎ ধর্মে-কর্মে আমার মতিগতি হলো নাকি? বা, সিলেটি রামায়ণ জিনিসটা কি? একটু ধৈর্য ধরুন, সবই বলছি।
sylheti language
অনেকেই জানেন যে অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্গত শ্রীহট্ট বা সিলেট জেলার পরিধি স্বাধীনতার আগে আরো বেশী ছিলো। সিলেটের একটা অংশ আসামের অন্তর্ভুক্ত হয়। বেশীরভাগই থেকে যায় পূর্ব পাকিস্তানে এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশে। এই সিলেট অঞ্চলের লোকেরা যে ভাষায় কথা বলেন সেটাকেই সিলেটি ভাষা বলা হয়। সিলেটির সাথে লেখার জন্য যে স্ট্যাণ্ডার্ড বাংলা ব্যবহৃত হয়, তার ফারাক অনেক। এমনকি, অনেক বাংলাভাষী লোকের পক্ষে এই ভাষাটা বোঝা সম্ভব নাও হতে পারে। আবার বাংলা ভাষার একটা ডায়ালেক্ট হওয়া সত্বেও অসমিয়া ভাষার সাথে সিলেটির  অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। 
sylheti Ramayan
এই সিলেটি ভাষার নিজস্ব লিপিও ছিলো। সেই লিপির নাম ছিলো সিলেটি নাগরী এবং এটাতে দেবনাগরী লিপির যথেষ্ট প্রভাব ছিলো। কালক্রমে এই সিলেটি নাগরী লিপির প্রসার কমতে কমতে একসময় এর অবলুপ্তি ঘটে। আজকের দিনে সিলেটি ভাষা বাংলা লিপিতেই লেখা হয়। এই সিলেটি ভাষাভাষী লোকেদের বিরাট একটা অংশ বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে, ভারতের বরাক উপত্যকার তিন জেলা - কাছাড়, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দি, শিলং শহরে এবং ইংল্যাণ্ডে থাকেন। ইংল্যাণ্ড এবং বাংলাদেশের সিলেটিদের একটা অংশ আবার সিলেটিকে একটি স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা দেওয়ার জন্য দাবী জানিয়ে আসছেন বেশ কিছুদিন ধরে।
sylheti nagari
যাইহোক, সিলেটি ভাষায় কোন এককালে রামায়ণও লেখা হয়েছিল। সবথেকে বড় কথা, এই রামায়ণের রচয়িতা ডাঃ সুন্দরীমোহন দাস, পুরো মহাকাব্যটাকে মাত্রই আটত্রিশ লাইনে ধরেছেন। যাকে বলে পরিবেশ বান্ধব রচনা। এই সিলেটি রামায়ণটাই এখানে তুলে দিলাম। পড়ে দেখুন বুঝতে পারেন কি না। আর অতি অবশ্যই কেমন লাগলো সেটা জানাতে ভুলবেন না।
sylheti to Bengali translation

সিলেটি রামায়ণ
ডাঃ সুন্দরীমোহন দাস
shovon chakraborty
অউ যে দেখ উঠইন সূর্য্য বিয়ানিয়া বেলা।
হউ গুষ্টির রাজা, দশরথ বড় ভালা।।
তিন বিয়া কইরলা রাজা পুড়া কপাল লইয়া।
এক রাণীরও না অইল একগুও পুয়া।।
কুবাইথনে আইলা মুনি রাজার অন্দর।
(অভিশাপ দিবার ছলে তাইন দিলা বর।।)*
গাট্টা গাট্টা চাইর পুয়া অইল রাজার ঘর।।
বড় রাণির পুয়া রাম, মাইজমর ভরত সুজন।
হরু রাণির দুই পুয়া, শত্রুঘ্ন আর লক্ষণ।।
দশরথে আইজ্ঞা দিলা, রাম অইবা রাজা।
শুনিয়া সুখি অইলা, রাজ্যের যত প্রজা।।
কৈকইর বাপের বাড়ীর, বান্দি কপাল পুড়া।
পিঠ যেলা মনও ওলা, ধনুর লাখান তেড়া।।
কৈকইরে কইল গিয়া, রাম রাজা অইত।
তোর দুই ছাওয়াল বুঝি ক্ষুদের জাউ খাইত।।
বড়র পুয়া রাজা অইলে, তুইন অইবে বান্দি।
ভরত রাজা অইবার লাগি, পড় গিয়া কান্দি।।
ইতা হুনি কৈকইর মাথা, চউরঙ্গী দিলাইল।
গুসা করি উপাস থাকি মাটির উপর হুইল।।
দশরথে শুনি কইলা, ইতা কর কিতা।
অউ দণ্ডে দিতাম পারি, তুমি চাও যেতা।।
কৈকই উঠিয়া কইলা রামরে পাঠাও বন।
আমার ভরতরে বওয়াও রাজ-সিংহাসন।।
সুয়ারাণীর কথা হুনি রাজা গলি গেলা।
কইলা, কান্দিও না গো সুণা, তুমার কথাই ভালা।।
রাম গেলা বনবাস, ভরত বড় বুকা।
সিংহাসন আনি রাখলা, রামর পাদুকা।।
বাগে পাইয়া বউ, চুরি করলা রাবণ।
বান্দর লইয়া করইন রাম, যুদ্ধর আয়োজন।।
বুদ্ধিমান জাম্বুবান কইল লও ঠেলা।
লঙ্কাত অখন কও যাইতায় কুন হালা।।
ফাল দিয়া হনুমান সাগর অইল পার।
লেইঞ্জর আগুন দিয়া কইরল লঙ্কা ছারখার।।
ইবাইদি গাছ দিয়া, বান্দরে বানাইল পুল।
বান্দরে রাইক্ষসে যুদ্ধ লাইগলো তুমুল।।
রাক্ষইসর বংশ হকল উজাড় করিয়া।
হুক হুক করে বান্দর লেংগুড় নাচাইয়া।।
বান্দর গুষ্টি লইয়া রাম যুদ্ধ কইরলা ভীষণ।
রাবণ মারি সীতা উদ্ধার ঔত্ত রামায়ণ।।
Ramayan sylheti language
* এই লাইনটা সিলেটি রামায়ণের মূল লেখায় আমি খুঁজে পাই নি। কিন্তু ইনটারনেটের অন্য একটা গ্রুপে এটা আছে। এই লাইনটাকে ধরলে পুরো রামায়ণ উনচল্লিশ লাইনের হবে। কিন্তু এর শব্দচয়ন দেখে এটা পরবর্তীকালে অন্য কারোর অবদান বলে মনে হয়।
sylheti Ramayan in Bengali language
মূল সিলেটি রচনা যেহেতু অনেকেরই বোধগম্য হবে না, সেইজন্য নীচে স্ট্যাণ্ডার্ড বাংলায় অনুবাদ করার একটা চেষ্টা করলাম। মূল কবিতার রসের সাথে এটার কোন তুলনাই হবে না, তবুও বুঝতে আশাকরি সুবিধা হবে।
sylheti to bengali by Shovon
সিলেটি রামায়ণ
ডাঃ সুন্দরীমোহন দাস
sylheti language script
ঐ  দেখো ওঠে সূর্য সকালবেলা,
সেই বংশের (সূর্য বংশ) রাজা, দশরথ বড় ভালো।
তিন বিয়ে করলেন রাজা, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে,
একটাও হলো না ছেলে, রাজার ঘরে।
কোত্থেকে এলেন মুনি রাজার ঘরে,
চার-চারটে সুন্দর ছেলে হলো এর পরে।
বড় রাণীর ছেলে রাম, মধ্যমের ভরত সুজন,
ছোট রাণীর দুই ছেলে, শত্রুঘ্ন আর লক্ষণ।
দশরথের ইচ্ছে রাম হবেন রাজা,
এই শুনে হলো খুশী, রাজ্যের যতো প্রজা।
কৈকেয়ীর বাপের বাড়ির বাঁদি মন্থরা,
দেহ যেমন, মনও তেমন, ধনুর মতন বাঁকা।
কৈকেয়ীকে বললো গিয়ে রাম রাজা হবে,
আর তোমার ছেলে খুদ-কুঁড়ো খাবে।
বড়র (রাণীর) ছেলে রাজা হলে, তুই দাসী হবি,
ভরত রাজা হবার জন্যে, কেঁদেকেটে গিয়ে পড়বি।
এই শুনে কৈকেয়ীর মাথায় দিলো চক্কর,
রাগে উপোস করে মাটিতে শুলো সত্বর।
দশরথ শুনে বললেন, কি করছো এটা?
তোমাকে তো দিতেই পারি, তুমি চাও যেটা।
কৈকেয়ী বললো তখন, রামকে পাঠাও বনে,
আমার ভরতকে বসাও রাজসিংহাসনে।
সুয়োরাণীর কথায় রাজা গলে গিয়ে জল,
বললেন কেঁদোনা সোণা, তোমার কথাই ভালো।
রাম গেলেন বনবাসে, ভরত বড় বোকা,
বসালেন সিংহাসনে, রামের পাদুকা।
বাগে পেয়ে (রামের) বউ, হরণ করলো রাবণ,
বানরসেণার সাথে রাম, করেন যুদ্ধের আয়োজন।
বুদ্ধিমান জাম্বুমান চিন্তায় কাতর,
কে যাবে লঙ্কায়, পার করে সাগর।
এক লাফে হনুমান, করলো সাগর পার,
লেজের আগুনে লঙ্কা, করলো ছারখার।
এদিকে বানরসেণা, বানালো এক পুল,
বানরে রাক্ষসে যুদ্ধ, বাধলো তুমুল।
রাক্ষসের বংশ ধ্বংস করে দিয়ে,
বানরেরা করে উল্লাস, লেজ নাচিয়ে।
বানরসেণা নিয়ে রাম, যুদ্ধ করলেন ভীষণ,
রাবণ মেরে সীতা উদ্ধার, এইতো রামায়ণ।
sundarimohan das
ভবিষ্যতে আরো কিছু সিলেটি লেখা তুলে ধরার ইচ্ছে রইলো।

1 comment:

  1. অসাধারন ……….! অনেক ভাল লাগল। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।সময় থাকলে আমার e shopping সাইটে ঘুরে আস্তে পারেন।

    ReplyDelete

Share